থিমের নামে দেবীর স্বরূপ বদলানো কি শিল্পের স্বাধীনতা?
বাঙালি হিন্দুর কাছে দুর্গাপুজো নিছক কোনো উৎসব না। এটি একদিকে শিল্প, অন্যদিকে পারিবারিক ও সামাজিক ঐতিহ্য এবং সর্বোপরি এটি দেবী দুর্গার আরাধনা। তাই মণ্ডপের শিল্পস্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, শিল্পীর সৃজনশীলতা নিয়েও বিতর্ক হতে পারে কিন্তু দেবীর প্রতিমা এবং পূজার পবিত্রতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে একজন হিন্দুর অন্তত একবার শাস্ত্রের দিকে তাকানো উচিত। কারণ বিষয়টি যখন ‘পুজো’র তখন এটিকে অবশ্যই আর পাঁচটা সাধারণ উৎসবের সাথে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।
সম্প্রতি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বাংলার দুর্গাপুজোকে ঘিরে ‘ধর্মীয় ঐতিহ্য’ এবং ‘সাত্ত্বিকতা’ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। ২৬ আগস্ট -এ কলকাতায় পুজো কমিটি, পুরোহিত ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে তাদের আলোচনাসভা নিয়েও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
তারপর থেকেই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক narrative ছড়ানো হচ্ছে যেন দুর্গাপুজোর শিল্পীস্বাধীনতা বন্ধ করে দেওয়া, কিংবা বাঙালির সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার ষড়যন্ত্র চলছে।
কিন্তু বিষয়টি শিল্পের স্বাধীনতা বন্ধের না, শিল্প সৃজনশীলতার প্রকাশ, যা হিন্দুধর্ম সবসময় সমর্থন করে। কিন্তু আমাদের একবার ভেবে দেখা উচিত আমরা শিল্পের মাধ্যমে দেবী দুর্গার অপমান করে ফেলছি না তো? হ্যাঁ এটুকুই বুঝতে হবে শুধু।
জুতো দিয়ে মণ্ডপসজ্জা, পুজোর পবিত্র পরিসরে আজানের প্রতীকী ব্যবহার, আখের ছিবড়ে দিয়ে মণ্ডপ নির্মাণ, দেবীর প্রতিমাকে অশাস্ত্রীয় ও বিকৃত আকার দেওয়া, অস্বাভাবিকভাবে বড় মাথা ও ছোট হাত, কিংবা দেবীর হাতে অস্ত্রই না রাখা এসবের বিরোধিতা করা কি সত্যিই ‘বাঙালিবিরোধী’ অবস্থান?
দেবীমাহাত্ম্য-এ মহিষাসুরবধের পূর্বে দেবতারা দেবীকে তাঁদের নিজ নিজ অস্ত্র প্রদান করেন। মহাদেব দেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দেন চক্র, বরুণ দেন শঙ্খ, অগ্নি দেন শক্তি, বায়ু দেন ধনুক ও তূণীর, ইন্দ্র দেন বজ্র অর্থাৎ দেবীর অস্ত্রধারিণী রূপটি কেবল আধুনিক শিল্পরীতি না, তার গভীর পৌরাণিক ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে।
আর অগ্নিপুরাণ-এর প্রতিমালক্ষণেও চণ্ডিকার দশভুজ রূপের সঙ্গে বিভিন্ন অস্ত্রের উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ মা দুর্গার প্রতিমাকে সম্পূর্ণ অস্ত্রহীন করে দেওয়া হলে সেটি নিছক ‘নতুন শিল্পভাষা’ হয় না। বরং শাস্ত্রীয় দুর্গা প্রতিমার পরিচিত রূপ থেকে একটি বিচ্যুতি ঘটে ।
বাংলার প্রচলিত মহিষাসুরমর্দিনী প্রতিমার বর্ণনাতেও দেবীর দশ হাতে ত্রিশূল, খড়্গ, চক্র, বাণ, শূল, ঢাল, ধনুক, পাশ, অঙ্কুশ প্রভৃতি অস্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়।
দেবীর হাতে অস্ত্র থাকলে আপত্তি কোথায়, কিন্তু দেবীর হাতই যদি প্রতীকী শিল্পের নামে অস্বাভাবিকভাবে ছোট করে দেওয়া হয়, অথবা অস্ত্র সরিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেটিকে প্রশ্ন করা যাবে না কেন?
নতুন নতুন থিম প্রেজেন্ট করুন, প্রতিযোগিতা করুন কার থিম কত সুন্দর হয়, কিন্তু তাই বলে দেবীর অপমান হবে এমন কাজ দয়া করে করবেন না।
বাংলার দুর্গাপুজো বরাবরই পরিবর্তিত হয়েছে। জমিদারবাড়ির অন্তঃপুর থেকে পুজো ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের উৎসবে পরিণত হয়েছে। গুপ্তিপাড়ার বারোয়ারি পুজোর ঐতিহ্য থেকে কলকাতার সর্বজনীন পুজোর বিকাশ এই প্রমাণ করে যে দুর্গাপুজো কখনও স্থির ছিল না।
বিশ শতকে সর্বজনীন পুজো আরও গণমুখী হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ও দুর্গাপুজো সামাজিক ও জাতীয়তাবাদী সংগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর হয়ে উঠেছিল।
পরবর্তীকালে থিম-পুজো এসেছে। মণ্ডপ হয়ে উঠেছে শিল্পের প্রদর্শনক্ষেত্র। বাংলার শিল্পীরা মাটি, বাঁশ, কাপড়, কাঠ, ধাতু, লোকশিল্প সবকিছুকে ব্যবহার করে অসাধারণ সৃষ্টিশীলতা দেখিয়েছেন। এই সৃজনশীলতাই বাংলার দুর্গাপুজোর অন্যতম সৌন্দর্য।
কিন্তু শিল্পের স্বাধীনতা আর আরাধ্য দেবতার স্বরূপ দুটিকে সবক্ষেত্রে এক করার চেষ্টা করলে সমস্যা তৈরি হয়।
মণ্ডপের বাইরের স্থাপত্যে শিল্পী যত খুশি পরীক্ষা করুন। সামাজিক বার্তা দিন। ইতিহাস বলুন। পরিবেশ নিয়ে কথা বলুন। নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষক, শ্রমিক, বন্যা, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ যে কোনও বিষয়কে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরুন।
কিন্তু যখন সেই পরীক্ষার কেন্দ্রে থাকেন স্বয়ং দেবী দুর্গা, তখন প্রশ্ন উঠবেই এই রূপ কি এখনও মা দুর্গার? বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রশ্নটা সঠিক ছিলো, “কেউ যদি অন্য কারো মাকে এনে আপনাকে বলে ইনি আপনার মা, তাহলে এটি আপনি মানতে পারবেন? “
হ্যাঁ বিষয়টি এমন। এর বাইরে তারা কিছুই বলেনি।
বাঙালি হিন্দু হয়ে কি সত্যিই এই প্রশ্ন করার অধিকার আমাদের নেই ?
২০১৯ সালে কলকাতার একটি দুর্গাপুজোয় সংস্কৃত স্তোত্রের সঙ্গে আজান বাজানোকে ‘communal harmony’ থিম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু communal harmony শুধু দুর্গাপুজোতেই কেন প্রচার হবে? ঈদ, ক্রিসমাস এসব সময়েও তো হতে পারে। তখন তো আমাদের নজরে এসব আসে না। তখন কেন মসজিদে অথবা চার্চে এসব থিম তৈরির জন্য কেউ প্রতিবাদ করেন না ? ২০২১ সালেই কলকাতায় এমন দুর্গাপ্রতিমার খবর প্রকাশিত হয়েছিল যেখানে মুখমণ্ডলকে সমকালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আদলে নির্মাণ করা হয়েছিল। আবার ২০২৫ সালে এমন প্রতিমার সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল যেখানে দেবীর হাতে প্রচলিত অস্ত্র ছিল না এবং প্রতিমা তৈরিতে প্রচলিত মাটি ব্যবহারের রীতিও বদলানো হয়েছিল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যখন কেউ বলে, “দেবী দুর্গার প্রতিমা অন্তত শাস্ত্রসম্মত স্বরূপের কাছাকাছি থাকুক”, তখন তাকে সঙ্গে সঙ্গে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’, ‘হিন্দুত্ববাদী’, ‘সংস্কৃতিবিরোধী’ ইত্যাদি অভিধায় চিহ্নিত করা হয়।
এখানে রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে ধর্মীয় প্রশ্নকে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে।
একজন বাঙালি হিন্দু যদি বলেন, “মণ্ডপে শিল্প হোক, কিন্তু মায়ের প্রতিমাকে বিকৃত করে নয়।” তাহলে সেটি কেন রাজনৈতিক বক্তব্য হবে?
একজন বাঙালি যদি বলেন, “মণ্ডপের পবিত্র পরিসরে এমন প্রতীক ব্যবহার করা উচিত নয় যা দেবী উপাসনার সঙ্গে সাং*ঘর্ষিক।” তাহলে সেটি কেন অসহিষ্ণুতা হবে?
একজন ভক্ত যদি বলেন, “মহিষাসুরমর্দিনীকে মহিষাসুরমর্দিনীর মতোই দেখতে চাই।” তাহলে সেটি কেন ‘শিল্পের বিরোধিতা’ হবে?
আসল বিষয়টি আরও গভীর, দুর্গাপুজো বাংলার সংস্কৃতি ঠিকই। কিন্তু দেবী দুর্গা কেবল বাংলার সাংস্কৃতিক প্রতীক নন, তিনি হিন্দুদের আরাধ্যা দেবী। এই দুটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই বাঙালির ঐতিহ্য।
বাঙালি সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে গেলে দুর্গাপুজোর শিল্পরূপকে বাঁচাতে হবে। আর হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে গেলে দেবীর শাস্ত্রীয় স্বরূপকেও সম্মান করতে হবে।
তাই প্রশ্নটি ‘VHP বনাম বাঙালি’ না। বিষয়টি হলো, “থিমের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু মাতৃপ্রতিমাকে বিকৃত বা অসম্মান করে নয়।”
শিল্প থাকবে, কিন্তু আরাধ্য দেবতার স্বরূপের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে না কেন?
আধুনিকতা থাকবে, কিন্তু শাস্ত্র ও ঐতিহ্যের সঙ্গে তার সংলাপ থাকবে না কেন?
বামপন্থী হোক, দক্ষিণপন্থী হোক, মধ্যপন্থী হোক কোনও রাজনৈতিক পরিচয়ই এই প্রশ্নগুলির উত্তর নয়।
উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরতে হবে শাস্ত্র, ইতিহাস এবং বাংলার নিজস্ব ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক স্মৃতির কাছে। কারণ দুর্গাপুজোকে শুধু ‘থিম’ বানিয়ে ফেললে আমরা হয়তো অসাধারণ একটি শিল্প-উৎসব পাব। কিন্তু মা দুর্গাকে ভুলে গেলে দুর্গাপুজো আর দুর্গাপুজো থাকে না।
। 🖋️ Mithila Bosu (যাজ্ঞসেনী) ২৯/০৮/২০২৬
